একজন নীরব সংগ্রামীর গল্প – আমার পিতা শওকত আলী
ঠিকানা: ১৫০
মোগলটুলি, ঢাকা
আজ আমি কথা বলছি
এমন একজন মানুষকে নিয়ে, যার
নাম ইতিহাসের পাতায় সোনালি অক্ষরে লেখা
না থাকলেও ইতিহাসের বাতাসে যার নিঃশব্দ উপস্থিতি রয়ে গেছে – তিনি আমার পিতা, শওকত আলী।
ভাষাসৈনিক শওকত আলী ছিলেন একজন
প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ, যাঁর হৃদয়ে ছিল
সমাজ পরিবর্তনের স্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়, ১৫০ মোগলটুলির সেই বাড়িটি হয়ে উঠেছিল গোপন
মিটিং ও রাজনৈতিক আলাপের আড্ডাস্থল। আমার পিতাই সেইসব বৈঠকের আয়োজক, এবং বঙ্গবন্ধুর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত
ছিলেন। ভাষার অধিকারের
দাবিতে নানা গোপন বৈঠক, মিছিল ও রক্তঝরা সংগ্রামে তিনি ছিলেন পর্দার
আড়ালের নির্ভরযোগ্য সংগঠক। তিনি প্রচারের
আলোয় থাকতেন না, কিন্তু নিজস্ব বৃত্তে ছিলেন আলোকবর্তিকা।
আন্দোলনের কারণে তিনি পুলিশী নির্যাতন ও কয়েকবার জেলবন্দি হয়েছিলেন; ১৯৫২ সালে তিনি সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে
গ্রেপ্তার হন এবং বহুদিন জেল খাটেন।
শওকত আলী
জন্মেছিলেন ১৯১৮ সালের ২০শে এপ্রিল, ঢাকার ঐতিহাসিক অঞ্চল গেন্ডারিয়ায়। তাঁর শৈশব কেটেছে পুরান ঢাকার ব্যস্ত গলি ও
আন্দোলনের উত্তাল বাতাসে। তিনি ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে
ছিলেন সচেতন এবং সাহসী।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তাঁকে ‘শওকত
মিয়া’ নামে বহুবার মনে করেছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান প্রথম ঢাকায় আসেন ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তখন তিনি ১৫০ মোগলটুলিতে
উঠেছিলেন।
“১৫০ মোগলটুলীতে প্রথমে উঠব ঠিক করলাম। শওকত মিয়া মোগলটুলী অফিসের দেখাশোনা করেন।
মুসলিম লীগের পুরানা কর্মী। আমারও বন্ধু। শামসুল হক সাহেব ওখানেই থাকেন…ঘোড়ার গাড়ি
ঠিক করলাম, ১৫০ মোগলটুলীতে পৌঁছে দিতে। দেখলাম, রসিক গাড়োয়ান মোগলটুলী লীগ অফিস চেনে।…শামসুল
হক সাহেব ও শওকত সাহেব আমাকে পেয়ে খুবই খুশী। শওকত আমাকে নিয়ে কী যে করবে ভেবেই পায়
না। তার একটা আলাদা রুম ছিল। আমাকে তার রুমেই জায়গা দিল। আমি তাকে শওকত ভাই বলতাম।
সে আমাকে মুজিব ভাই বলত।“– অসমাপ্ত আত্মজীবনী
পরে এই ১৫০ মোগলটুলী বাড়ীটি শওকত আলীর বাসভবন হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানেই আমার জন্ম
হয় ১৯৬৩ সালে। এটি শুধু আমাদের
পরিবারের নয়, ইতিহাসেরও এক
নিঃশব্দ অধ্যায়।
ছাত্রলীগের জন্ম
বঙ্গবন্ধু’র
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকেঃ
১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তারিখে
ফজলুল হক মুসলিম
হলের এসেম্বলি হলে এক সভা ডাকা হল, সেখানে স্থির
হল একটা ছাত্র
প্রতিষ্ঠান করা হবে যার নাম হবে ‘পূর্ব
পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’।…
প্রতিষ্ঠানের অফিস করলাম
১৫০ নম্বর মোগলটুলী। মুসলিম লীগ নেতারা
কয়েকবার চেষ্টা করেছেন
এই অফিসটা দখল করতে, কিন্তু
শওকত মিয়ার জন্য পারেন নাই। আমরা ‘মুসলিম
লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ নাম দিয়ে সাইন বোর্ড লাগিয়ে
দিয়েছিলাম। এখন পুর্ব
পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অফিসও করা হল। শওকত মিয়া টেবিল,
চেয়ার, আলমারি সকল কিছুই বন্দোবস্ত করল। তাকে না হলে, আমাদের
কোন কাজই হত না তখন। আমরা যে কয়েকজন তার সাথে মোগলটুলীতে থাকতাম, আমাদের খাওয়া
থাকার ভার তার উপরই ছিল।
… মোগলটুলীতেই ন্যাশনাল গার্ডের অফিস করা হয়েছিল। তিনতলা বাড়ি, অনেক জায়গা ছিল। (পৃষ্ঠাঃ
৮৮, ৮৯)
১৫০ মোগলটুলী, ঢাকাঃ
ওয়ার্কার্স
ক্যাম্প।
এখান
থেকেই
আওয়ামী
লীগের
প্রাথমিক
সাংগঠনিক
প্রক্রিয়া
শুরু
হয়।
এ
বাড়িতেই
শওকত
আলী
থাকতেন।
ছবিতে
উক্ত
বাড়ির
ভেতেরের
অংশের
এক
পাশের
৩য়
তলার
বারান্দা
দেখা
যাচ্ছে।
বারান্দার
সাথে
অর্ধেক
পর্দা
সরানো
যে
ঘরটি
দেখা
যাচ্ছে,
এটিতেই
বঙ্গবন্ধু
থাকতেন।
এই
ঘরটি
আমাদের
কাছে
বড়
ঘর
নামে
পরিচিত
ছিল,
কারণ
এটা
ছিল
আয়তনে
বড়।
এটা
শওকত
আলীর
নিজস্ব
ঘর
ছিল।
এই
ঘরের
আরেকটা
বৈশিষ্ট
হচ্ছে
এর
ফ্লোর
গরমের
দিনেও
খুব
ঠান্ডা
থাকত।
আব্বার
কাছে
শুনেছি,
গরমের
দিনে
সব
নেতাকর্মীরা
মিলে
এই
ঘরে
মাটিতেই
ঘুমাতেন।
রাজনৈতিক জীবন ও জনপ্রিয়তা
শওকত আলী ছিলেন একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদ। তিনি কখনও
নিজের জন্য কোনো পদ চাননি, কিন্তু
সব সময় বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকেছেন। পুরান ঢাকার চকবাজার, মিটফোর্ড, লালবাগ
এলাকায় তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। স্থানীয় জনগণ তাঁকে একজন প্রতাপশালী, সোজাসাপ্টা ও নীতিবান নেতা হিসেবে চিনতেন।
মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর যুগ্ম সম্পাদক পদ
১৯৬৯ সালে লেখক ও সাংবাদিক বদরুদ্দিন উমরকে দেওয়া এক
সাক্ষাৎকারে শওকত আলী জানান, আওয়ামী
লীগের কমিটি গঠনের সময় মওলানা ভাসানী প্রথমে শেখ মুজিবুর রহমানকে অন্তর্ভুক্ত
করতে চাননি। কিন্তু শওকত আলীর দৃঢ় অবস্থানের কারণে মওলানা ভাসানী তাঁকে যুগ্ম
সাধারণ সম্পাদকের পদ দিতে বাধ্য হন।
রোজ গার্ডেনে বৈঠকের আগে শওকত আলী মওলানা ভাসানীকে প্রস্তাব
দেন – তিনি (মওলানা ভাসানী) সভাপতি, শামসুল হক সেক্রেটারি, আর শেখ
মুজিবুর রহমান হবেন একমাত্র যুগ্ম সম্পাদক। ভাসানী আপত্তি করে বলেন, “শেখ ছাত্র রাজনীতি করে, তাকে আর কোন Public
Organisation-এর সাথে জড়িও না।” কিন্তু শওকত আলী তাঁর সঙ্গে একমত হননি।
(সূত্র: ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্র, সম্পাদক: আবুল কাসেম ফজলুল হক ও এম আর মাহবুব, পৃ. ২৭৮–২৭৯)
শওকত আলী কোনো বড়
মঞ্চে ভাষণ দেননি, কিন্তু ইতিহাসের
নেপথ্যে তিনি রেখে গেছেন এক বিশাল প্রভাব। ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা,
বঙ্গবন্ধুর উত্থান এবং
প্রগতিশীল চেতনার বিকাশ – সব কিছুতেই তাঁর
অবদান আজও অদৃশ্য আলো হয়ে পথ দেখায়।
শওকত আলীর জীবন
আমাদের শেখায় – নায়ক হতে হলে
দরকার শুধু বিবেক, সাহস আর সময়ের
পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা। তিনি ছিলেন ইতিহাসের সেই নীরব সিপাহী, যাঁদের নাম বড় হরফে লেখা হয় না, কিন্তু ইতিহাসের মূল পাতাগুলোর ভিত তাঁদের
কাঁধেই দাঁড়িয়ে থাকে।
১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫
ভোরবেলা পাশের বাসা থেকে ভেসে আসছিল মানুষের উৎকণ্ঠিত হৈচৈ।
কৌতূহলভরে জানতে চাইলে বলা হলো – “রেডিও চালাও।”
রেডিও চালাতেই ভেসে এল মেজর ডালিমের কর্কশ কণ্ঠ। মুহূর্তেই
বুক কেঁপে উঠল আমার। মা অঝোরে কাঁদতে লাগলেন, কিন্তু
আব্বা নীরব রইলেন – চোখের জল গোপন করে ভেতরে ভেতরে ভীষণভাবে
বিচলিত হলেন।
তিনি কয়েক জায়গায় ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেন, কিন্তু কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হলো না। কিছুক্ষণ পর
আমাদের মেইন গেট বন্ধ করতে বললেন, আর গেট
বন্ধ হওয়ার পরও বারবার নিশ্চিত হচ্ছিলেন, “গেট
ঠিকমতো লাগানো আছে তো?”
আব্বার দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা ছিল। তিনি শুয়ে
পড়লেন। সেদিন দুপুরে কিংবা রাতে কিছুই খেলেন না।
পরদিন সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলেন না, আমরা তাঁকে ডাকতে গিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম – কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, আর মুখ
দিয়ে বের হচ্ছে ফেনা। সেদিন কারফিউ কিছুটা শিথিল থাকায় তড়িঘড়ি করে তাঁকে হলি
ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যাই। ডাক্তার জানালেন – তিনি স্ট্রোক
করেছেন এবং কোমায় চলে গেছেন।
১৭ই আগস্ট গভীর রাতে আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। চলে
গেলেন পুরান ঢাকার মানুষের কাছে পরিচিত সেই প্রিয় নাম – ‘দুর্ভিক্ষ শওকত’।
১৯৪৩-৪৪ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরের সময়, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জন্য তাঁর অক্লান্ত শ্রম আর মানবিক
সেবার জন্যই তিনি এই ভালোবাসার উপাধি পেয়েছিলেন।
শওকত আলী শুধু একজন
রাজনৈতিক কর্মিই ছিলেন না – তিনি ছিলেন একজন
আদর্শ স্বামী, পিতা, ন্যায়ের প্রতীক এবং আমাদের পরিবারের মূল
ভিত্তি। তাঁর সন্তান হিসেবে আমি গর্বিত যে এমন একজন মানুষ আমার রক্তে, স্মৃতিতে ও চেতনায় প্রবাহিত।
তোমায় সালাম পিতা;
ইতিহাস তোমাকে হয়তো
চুপিচুপি চিনে রেখেছে, কিন্তু আমরা
তোমাকে গর্বভরে স্মরণ করি।
---সালাহউদ্দীন আহমেদ আজাদ
(শওকত আলীর বড় ছেলে)


Comments
Post a Comment